আমফনে রাজ্যে মৃতের সংখ্যা ৮০, পুনরায় সব ঠিক করতে আরও হাজার কোটি

রাজ্যে ঘূর্ণিঝড় আমপনে কমপক্ষে ৮০ জন নিহত হয়েছেন, বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন। এর মধ্যে কলকাতায় ১৯ জন এবং বিভিন্ন জেলায় ৬১ জন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাজ্য সরকার ক্ষয়ক্ষতি পুনরুদ্ধারের জন্য এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দও করেছে। আর্থিক সংকট চলছে করোনার পরিস্থিতিতে। তাই দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রতিটি পয়সা হিসেব করে ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্য নিহতদের পরিবারকে আড়াই লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণও দেবে।

প্রশাসনের ভূমিকা হিসাবে, আম্পান ৪০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে দাঙ্গা চালিয়েছিল। সাত বা আটটি জেলা খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল, আরও চার বা পাঁচটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। প্রতিটি বিভাগকে ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেছিলেন, “১৭৩৭ সালে এ ধরনের বিপর্যয় হয়েছিল। সতর্কতা পাওয়ার পরে পাঁচ লক্ষ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হওয়ায় পাঁচ লক্ষেরও বেশি লোকের প্রাণ বাঁচানো হয়েছিল। দুই ২৪ পরগনা এবং কলকাতায় বিশাল ক্ষতি হয়েছে। এর তীব্রতা আয়লারের চেয়ে অনেক বেশি। এটি একটি ভয়াবহ বিপর্যয়।

মুখ্যমন্ত্রী পাবলিক ওয়ার্কস বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে ঠিকাদার বার বার প্যাচ না দিয়ে কমপক্ষে তিন বছরের জন্য রাস্তাটি নির্মাণের জন্য দায়বদ্ধ করে তোলা। তিনি কেন্দ্রীয় সড়ক যোগাযোগমন্ত্রী নীতিন গডকরির সাথে যোগাযোগ করেন এবং প্রধান সচিব এবং গণপূর্ত সচিবকে রাস্তাটি পরিকল্পনার নির্দেশ দেন। তিনি প্রয়োজনে রাজ্য রোডকে কেন্দ্রীয় সড়কের সাথে সংযুক্ত করার পরামর্শও দিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়,  ‘‘আর্থিক অবস্থা খারাপ। কেন্দ্রের থেকে কিছু পাইনি। আয় কিছুই নেই। পুরো খরচ ঘর থেকে করতে হচ্ছে। কী ভাবে চলবে জানি না।’’ ইতিমধ্যেই বকেয়া ৫৩ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রের কাছে দাবি করেছে নবান্ন।

প্রশাসন আবাসন প্রকল্প, সেচ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পুকুর পরিষ্কার, মাছ ছাড়া ও ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পকে সংযুক্ত করে পুনর্গঠন করবে। সরকার তাত্ক্ষণিকভাবে পানীয়জল, ওষুধ, খাদ্য, মেডিকেল ক্যাম্প, রেশন-অংগনোরি সেবা সক্রিয় করতে চায়। মমতা ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি কৃষকদের সহায়তার একটি রূপরেখা তৈরির জন্যও একটি প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আম্পান পরবর্তী পুনর্গঠনে মন্ত্রীদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে জেলা প্রশাসকদের সাথে সহযোগিতা করার জন্য মন্ত্রীদের এবং জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশনা দেন।

প্রশাসন জানিয়েছে, কলকাতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে চারজন ডুবে গিয়েছিলেন এবং পাঁচজন মারা গেছেন। রিজেন্টস পার্কে প্রাচীর ধসে এক মহিলা ও তার ছেলে মারা গিয়েছিল এবং পাত্রের টালি ভাত ভেঙে একজন মারা গিয়েছিল। ঝড়ের কবলে পড়ে টিনের ছাদে ধাক্কা খেয়ে শম্ভুনাথ পন্ডিত স্ট্রিটে এক যুবক মারা যান। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, এই ঝড়ে আরও দু’জন নিহত হয়েছেন। নিহত চারজনের পরিচয় রাত অবধি জানা যায়নি। বুধবার রাতে বাড়িটি ধসে পড়লে রজত পোলান নামে এক যুবকের একটি সুইমিং পুলে মারা যান। আগের দিন, বিকাশ সিং নামে এক যুবক তার টিয়ার অপসারণ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মরা যান! টিকিয়াপাড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে খালেদ নিশাদ নামে এক ব্যক্তি মারা যান। বানতার সানপুরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুই যুবকেরও মৃত্যু হয়। হাওড়ার বিভিন্ন অঞ্চল গাছ ভেঙে নিমজ্জিত হয়ে বিধ্বস্ত হয়েছিল।

উত্তরাঞ্চলীয় শহরতলিতে এবং উত্তর ২৪ পরগনার প্রায় ৪৫,০০০ বাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ১৫ মারা গেছে। আহত হয়েছে ৬৫ জন। জেলার প্রায় সর্বত্র বিদ্যুৎ পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে। প্রায় ১১০০০ গাছ উপড়ে ফেলা পরেছে।

হলদিয়া মহকুমায় চারজন এবং পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি মহকুমায় দুজন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০ জন। নন্দীগ্রামের দুটি ব্লকের ছয় হাজার বাসিন্দা গৃহহীন। জেলার পঞ্চাশ শতাংশ ক্ষয়ক্ষতির খবর এখনও পাওয়া যায়নি। এগরা মহকুমায়ও অনেক ক্ষতি হয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরে দুজন নিহত হয়েছেন। দন্তান, কেশিয়ারি, মোহনপুর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ অঞ্চল।

নদিয়ায় ৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আহত ৬১ জন। প্রচুর ঘর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ৩৩৬১ জনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মুর্শিদাবাদে পাঁচ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। প্রায় ১১০০০ বাসিন্দা ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। ধান, আম, লিচু, পান, পাট, তিল, শস্যসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ১৬ হাজার হেক্টর জমি এবং ১ লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোটে প্রাচীর ধসে রাধারমন ঘোষ (৭২) নামে এক বৃদ্ধ মারা যান। আশঙ্কা করা হচ্ছে জেলায় প্রায় 300 কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। বোরো ধান ও তিলের আবাদে বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কৃষি অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ৭৬.৫ শতাংশ জমির ফসল তোলা হয়ে গিয়েছিল। জমিতে কাটা ধান কাটা বৃষ্টির জলে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ১২,৩৪০ হেক্টর জমিতে তিলের আবাদ হয়েছে যা এখন জলের নিচে। প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমির আনাজও নষ্ট হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।